সুপার হিউম্যান বা সুপার হিরোর কথা বললে আমাদের মাথায় সবার আগে যে নামটা মাথায় আসে সেটা হলো সুপারম্যান। যারা আমার মতো সাই-ফাই মুভি দেখতে পছন্দ করেন তাদের ক্ষেত্রে এই লিস্ট অনেক বড়। কারণ সাই-ফাই মুভি মানেই যেন সুপার পাওয়া বা সুপার হিরোর খেলা। মার্ভেল কমিক্স হলে তো কথাই নাই। কিন্তু এগুলো কি শুধু কমিক্স বা মুভিতেই সম্ভব? আমরা কি সুপার হিউম্যান বানাতে পারি বাস্তবে?
সুপার হিউম্যান এর সঙ্গা দিতে হলে সুপার হিউম্যান হলো অন্যসব মানুষের থেকে আলাদা এবং তার মধ্যে এমন এক বা একাধিক গুন বা ক্ষমতা আছে যেটা একটা নরমাল মানুষের নেই বা থাকার কথাও না। হতে পারে সে এসব গুন বা ক্ষমতা ন্যাচারালি পেয়েছে অথবা নিজের উপলব্ধি বা প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে অর্জন করেছে। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের "ক্যাপ্টেন আমেরিকা" বা "দ্যা ইনক্রিডিবল হাল্ক" এর সব থেকে ভালো উদাহরণ। মার্ভেলের X-Men মুভি সিরিজটি দেখলে আপনি এই পুরো কনসেপ্টটাই ক্লিয়ার হয়ে যাবেন।
তাহলে এবার মেইন পয়েন্টে আসা যাক। সুপার হিউম্যান এর সঙ্গা যদি এটাই হয় তাহলে সুপার হিউম্যান আসলেই সম্ভব। আর সেটা অনেক ভাবেই সম্ভব। কিন্তু আজকে আমরা শুধু জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে কিভাবে আপনি একজন সুপার হিউম্যান হতে পারবেন সেটাই আলোচনা করবো। জিনের মিউটেশনের মাধ্যমে চাইলেই আমাদের মানবদেহের যেকোনো বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা সম্ভব। তাহলে জিন কি আর মিউটেশনই বা কি?
জিন হলো ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) এর একটি অংশ, যা জীবের বৈশিষ্ট্য এবং কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ আপনি দেখতে কেমন হবেন, আপনার বুদ্ধি কিরকম হবে, আপনার রুচি-ব্যবহার কিরকম হবে ইত্যাদি এরকম সকল বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করা থাকে জিনের ভিতরে। অনেকগুলো জিনকে একত্রে বলে জিনোম। আর মিউটেশন হলো ডিএনএ সিকোয়েন্সে পরিবর্তন, যা জিনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ মনে করুন আপনার জিন অনুযায়ী আপনি লম্বা হবেন কিন্তু এখন যদি আপনার ডিএনএ বা জিনোম সিকুয়েন্সের যে জিনটি আপনার লম্বা হওয়ার বৈশিষ্ট্য বহন করছে সেটাতে আপনি পরিবর্তন করে খাটো হওয়ার বৈশিষ্ট্য ঢুকিয়ে দিলেন। এই পরিবর্তন করাটাই হলো মিউটেশন। আর আপনার মধ্যে মিউটেশন হলে আপনি একজন মিউট্যান্ট।
সহজ ভাষায় কোনো জীবের জিনোম সিকুয়েন্স নিয়ে কাজ করাই হলো জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং। মানুষের জীনোম সিকুয়েন্সে পরিবর্তন এনে তাকে সুপারহিউম্যান বানানো সম্ভব। জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর যত গুলো মেথড বা পদ্ধতি রয়েছে (যেমনঃ CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি, রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি, জিন থেরাপি, জিন ক্লোনিং ইত্যাদি) তাদের মধ্যে সব থেকে সম্ভাবনাময় হলো "CRISPR-Cas9" প্রযুক্তি যা একটি জিন এডিটিং টুল। এই টুলের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট জিনকে টার্গেট করে সেটি পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা নতুন জিন যোগ করতে পারেন। এই প্রযুক্তি চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে, যেমন ক্যান্সার, এইডস এবং জেনেটিক রোগের চিকিৎসা।
তবে জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মোটেও এরকম সহজ কিছু নয়। বিষয়গুলো অনেক কমপ্লেক্স আর সেনসিটিভ। বিষয়টা এরকম না যে আপনার বুদ্ধির জন্য যে জিন আছে সেই জিনের মিউটেশন করলেন আর আপনি একজন সুপার কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য পেয়ে গেলেন। যেমন সৌন্দর্য্য, বুদ্ধি, শক্তি ইত্যাদিসহ মানবদেহের আরও অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলোর জন্য মাল্টিপল জিন দায়ী। এর পাশাপাশি জিন তার চারপাশের পরিবেশ দাড়াও প্রভাবিত হয়ে জীবের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে থাকে। যদিও এসব এক্সপেরিমেন্ট মানবদেহে করার কোনো প্রমাণ মিলে নি কিন্তু অন্যান্য প্রানী যেমন ইদুর, খরগোশ ইত্যাদিতে করতে দেখা গেছে এবং বিজ্ঞানীরা সফলও হয়েছেন।
আসুন মানবদেহের কিছু সুপার পাওয়ারওয়ালা জিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই যেগুলোর পরবর্তন করে আসলেই আপনি একজন সুপার ইউম্যান তথা সুপার হিরো হতে পারবেন।
✅ Speed Gene - আমাদের সবার শরীরে একটি জিন থাকে যেটির নাম ACTN3 আর এই জিনটি পেশী তন্তুগুলির দ্রুত নড়াচড়ার জন্য দায়ী একটি প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা প্রদান করে, যা আমাদের দৌড়াতে সক্ষম করে। আপনার ACTN3 জিন পরিবর্তন করে আপনি ডিসি সুপারহিরো 'ফ্ল্যাশ' এর মতো নাহলেও হয়তো হুসাইন বোল্টকে ঠিকই দৌড়ে হারাতে পারবেন।
✅ Bone Gene - এই জিনের নাম হলো LRP5 যা আমাদের হাড়ে ঘনত্ব আর শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। G171V মিউটেশন হাড়ের খনিজ ঘনত্ব বৃদ্ধি করে, যার ফলে অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী এবং পুরু হাড় তৈরি হয় এবং হাড় ভাঙা থেকে উচ্চ প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভ করা যায়। এর মাধ্যমে আপনি "The Incredible Hulk" এর মতো শক্তিশালী না হলেও জন সিনা বা ব্রোউন স্ট্রোম্যান এর থেকেও বেশি শক্তিশালী হতে পারবেন।
✅ Pain Insensitivity Genes - শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এরকম রোগও আছে যে রোগের কারণ সেই মানুষটা কখনো কোনো রকমের পেইন বা ব্যাথা অনুভব করতে পারেন না। ধরুণ আপনাকে আঘাত করা হয়েছে বা আপনার একটা হাত/পা কেটে ফেলা হয়েছে কিন্তু আপনি কোনো ব্যাথা অনুভব করতে পারছেন না। এই রোগটাকে বলে CIP (Congenital Insensitivity to Pain). SCN9A, FAAH, PRDM12 জিনের মিউটেশনের জন্য সিআইপি রোগ হয়। এই জিনগুলোর মিউটেশনের মাধ্যমে আপনি ডিসি সুপারহিরো Cyborg না হতে পারলেও ব্যাথা বিহীন মানুষ ঠিকই হতে পারবেন। প্রেমে ছ্যাকা খেলে সেটা আলাদা ব্যাপার হলেও হতে পারে।
✅ The Sleepless Gene - স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ব্রেইন কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং এই ক্লান্তিভার দূর করতে আমাদের প্রতিদিন ঘুম প্রয়োজন হয় মিনিমাম ৬-৮ ঘন্টা। কিন্তু আপনি যদি DEC2, ADRB1 জিনে মিউটেশন ঘটান তাহলে আপনার তেমন কোনো ঘুমেরই প্রয়োজন পড়বে না। অতি সামান্য ঘুমেও আপনার তেমন কোনো সমস্যাই হবে না, না থাকবে স্বল্প ঘুমের জন্য হওয়া স্বাস্থ্য ঝুকি। আপনার ব্রেইন থাকবে একদম স্বাভাবিক।
✅ EPAS1 Gene - পৃথিবী থেকে যত উপরে যাবো তত অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। আর অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে আপনার শরীরও কাজ করা কমিয়ে দিবে অথবা আপনি মারাও যেতে পারেন। কিন্তু EPAS1 জিন রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এই জিনের মিউটেশনে আপনি এলিয়েনদের মতো মঙ্গল গ্রহে শ্বাস নিতে না পারলেও মাউন্টেন্ট এভারেস্টে ঠিকই শ্বাস নিয়ে বেচে থাকতে পারবেন।
এরকম আরও অনেক সুপার পাওয়ার ওয়ালা জিন আমাদের শরীরে আছে যেগুলোর মিউটেশন করিয়ে আমরা হয়তো সাই-ফাই মুভি, কমিক্সের মতো পাওয়ারফুল সুপার হিউম্যান হতে পারবো না কিন্তু অন্যান্য মানুষদের তুলনায় বেশ খানিকটা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ঠিকই হতে পারবো হয়তো। যদিও বা এরকম সুপার হিউম্যানের কোনো নজির এখনো পাওয়া যায় নি। আপনি ট্রাই করলে আপনিই হয়তো হয়ে যেতে পারেন প্রথম সুপার হিউম্যান ইন রিয়্যাল লাইফ।
সব থেকে মজার ব্যপার হলো ২০১৮ সালে চীনের কিছু বিজ্ঞানী প্রথমবারের মধ্যে Gene-Edited বেবি জন্ম দিতে সফল হয়। যমজ দুই বাচ্চার বাবা এইচআইভি আক্রান্ত ছিল, কিন্তু বিজ্ঞানীরা সেই বাচ্চাদের ভ্রুণের জিনোম সিকুয়েন্স এমন ভাবে চেঞ্জ করে দেয় যাতে বাবার থেকে পাওয়া এইচআইভির জিন বা ডিএনএ তাদের শরীরে না আসে এবং তারা এই কাজে সফলও হন। এই ঘটনার পর সারা বিশ্বে এক বিশাল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। কিন্তু চাইনিজ বায়োফিজিসিস্ট He Jiankui এই বিজ্ঞানীদের "Rogue Scientist" বলে আখ্যা দেয় এবং চাইনিজ সরকার মানব ভ্রূণে জিন সম্পাদনা নিষিদ্ধ থাকায় চীনা আইন লঙ্ঘনের জন্য সেই বিজ্ঞানীদের তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়। বর্তমানে খুবই কম সংখ্যক দেশই মানব ভ্রূণে জিন সম্পাদনার অনুমতি দেয় এবং কোথাও এই ধরনের ভ্রূণ গর্ভে স্থাপন করা বৈধ নয়।
তাহলে এখন বলুন কবে হচ্ছেন সুপারহিরো? আর সুপারহিরো হলে কোন সুপারহিরো হতে চান?
Sources:
--------------
ℹ️ BBC Science Focus Magazine: https://www.sciencefocus.com/future-technology/could-we-make-a-superhuman
ℹ️ Medicover Genetics: https://medicover-genetics.com/can-a-genetic-change-make-you-superhuman/
ℹ️ Wikipedia: https://en.wikipedia.org/wiki/Superhuman